Monday, June 18, 2012

ঋত্ত্বিক-মৃণাল-সত্যজিৎ-এর ব্যাটন আর দিবাকরের 'সাংহাই'

ভাসিলিস ভাসিলিকোস, গ্রীক মিলিটারি জুন্টা রেজিম, কোস্টা গাভ্রাস,সাংহাই- নতুন চীনের নতুন বিপ্লব এবং দিবাকর ব্যানার্জী। সব মিলিয়ে একটা জম্পেশ ব্যাপার।
দিবাকর হ্যান্ড হেল্ড ক্যামেরা, লো কি লাইটিং, জাম্প কাট ইত্যাদি সিনেমার নানা বিপ্লবকে সিনেমায় ব্যবহার করেন অবিরল।
ভাসিলি ভাসিলিকোস গ্রীসের সেই সাংবাদিক যিনি তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য গ্রীস থেকে বহিষ্কৃত ছিলেন সাত বছর। এখন গ্রীসের পক্ষে রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতিনিধি।
গ্রীস, সেই দেশ যেখানের অর্থনীতি নাকি গোটা বিশ্বের অর্থনীতিকে নাজেহাল করে ছেড়ে দিচ্ছে। গ্রীস সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রাচীন পিঠস্থান।
সাংহাই, চীনের সেই বন্দর যা বহু শতাব্দী ধরেই বাণিজ্যকে তার পরিচয় বানিয়েছিল। সাংহাই, মাও-এর সাংস্কৃতিক বিপ্লবে কম্যুনিষ্ট পার্টির সদর দপ্তরে কামান দাগার ডাকের যন্ত্রী জিয়াং কুইং ও বিখ্যাত গ্যাং অফ ফোর-এর আরো তিনের দাপটের অঞ্চল। সাংহাই, মাও-এর পতনের/মৃত্যুর পরে দেও জিয়াং পিং-এর নয়া চীন সাম্রাজ্যের খোলা বাজার নীতির অন্যতম কেন্দ্র। এখানেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্পেশাল ইকোনমিক জোন আছে। সেই স্পেশাল ইকোনমিক জোন যেখানে পুঁজিপতির স্বার্থ ছাড়া বাকী সব কিছুই অপ্রয়োজনীয়। সমাজতান্ত্রিক বলে কথিত চীনের শ্রমিকের সেখানে কোনো অধিকারই নেই, যা আছে তা নয়া ক্রীতদাসত্ব।
এখন এই সব মিলিয়ে আপনি যদি সাংহাই দেখতে যান, আজ্ঞে বেড়াতে না, সিনেমাটি দেখতে, তাহলে একটাই বিপ্লবের সম্মুখীন হবেন। মূল ধারার হিন্দি সিনেমায় এই প্রথম একটি সিনেমা বানানো হল যেখানে রাজনীতি মানে কিছু বোকা সংলাপ না, এর সামান্য হলেও গভীরে ঢোকার চেষ্টা আছে।
যা নেই তা হল কোস্টা গাভ্রাসের ডিরেক্ট সিনেমা। দিবাকরের সাংহাইতে সব চরিত্র কাল্পনিক গোত্রের যে ডিসক্লেইমার দেওয়া হয় গাভ্রাস তার পিন্ডি চটকে দিয়েছিলেন এই ভাসিলিস-এর উপন্যাসটি নিয়ে বানানো বিখ্যাত ফরাসী সিনেমা 'Z' এ। সেই সিনেমার শুরুতে লেখা থাকতো,
“Any resemblance to real events, to persons dead or living, is not accidental. It is INTENTIONAL.”
অধ্যাপক আহমদী (প্রসেনজিত চ্যাটার্জী) আসছেন প্লেনে চেপে, নতুন ভারত নগরে যে উচ্ছেদ হচ্ছে স্পেশাল ইকোনমিক জোন বানানোর জন্য সেই উচ্ছেদের বিরোধ করতে। সিনেমা এখান থেকে শুরু হয়। আহমদী আধুনিক ভারতের ক্ষমতাকাঠামোর অভ্যন্তরকে জানেন। নিজের কাজ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে করতে পারেন। প্লেন থেকে নেমে এক পাতি হিরোইনের সঙ্গে ঘণিষ্ঠ হয়ে ছবি তোলার ফাঁকেই জানিয়ে দ্যান তিনি সেই অভিনেত্রীর নাচের অনুষ্ঠানে আসবেন যদি অভিনেত্রী আসেন তাঁর সঙ্গে উচ্ছেদ বিরোধীতার মঞ্চে। তাঁর এককালের ছাত্রী( কল্কি কোয়েচলিন) কে যখন স্থানীয় থানার দুই সাব ইন্সপেক্টর সাদা পোষাকে এসে থানায় যেতে বলে হুমকী দিয়ে তখন তিনিও বলেন হ্যারাসমেন্ট-এর চার্জে তিনিও তাঁদের জেলে ঢোকাতে পারেন এবং চাইলেই পারেন তাঁদের মেয়েদের বেআইনী ভাবে থানায় ডাকিয়ে আনতে। এর মানে অধ্যাপক জানেন ক্ষমতা কিভাবে কাজ করে। কিন্তু সেই অধ্যাপককে উচ্ছেদ বিরোধী কনভেনশনের জায়গাতেই একটি ম্যাটাডোর চাপা দিয়ে বেরিয়ে যায়। অধ্যাপকের দুর্ঘটনা বা খুনের চেষ্টা কোনটা দাঁড়াবে তা ঠিক করার জন্য মহিলা এক মুখ্যমন্ত্রী(সুপ্রিয়া পাঠক)-র সরকার একটি কমিশন বসায়। দক্ষিণী এক আইসিএস(অভয় দেওল)-এর নেতৃত্বে এক সদস্যের কমিটি নানা বাধা বিঘ্নের মধ্যে সেই কমিটিকে তামাশা হওয়ার থেকে রক্ষা করতে থাকে। একদিকে চীফ সেক্রেটারি(ফারুক শেখ) খোলাখুলি জানিয়ে দ্যান কমিটির থেকে সরকারী বয়ানের বাইরের কিছু চাই না। অন্যদিকে এক পর্নো কাম স্থানীয় চিত্রসাংবাদিক (ইমরান হাসমি) ও ছাত্রীটির চেষ্টায় নানা সূত্র জোগাড় হতে থাকে। যথারীতি পুলিশ তদন্ত করে না। তদন্তের নামে নষ্টামো চালিয়ে যায়। সিনেমাটি দ্রুত গতিতে এগোতে থাকে এবং যখন শেষ হয় তখন ভারতনগর আসলে যে আধুনিক ভারত যা ইন্ডিয়া নামেই বেশী পরিচিত তা বেশ বোঝা যায়।

দিবাকরের সাফল্য হল কোনো রকম নাটকীয়তা ছাড়াই খুব ঠান্ডা মাথায় আসল নাটকটাকে ধরে রেখেছেন। এমনকি সিনেমার শেষেও দেখা যায় অধ্যাপকের হত্যাকারী মুখ্যমন্ত্রীর সাধের ভারতনগরের মুখ্য অভিভাবক হয়ে ওঠেন আক্রান্ত অধ্যাপকের স্ত্রী, যিনি অধ্যাপকের সঙ্গেই এককালে এই সব আন্দোলনে ছিলেন, কিন্তু তারপরে তাঁর মোহভঙ্গ হয় এবং তিনি সুন্দর ভাবে রাজনীতির আঙিনায় নিজের জমি বানিয়ে নিয়েছেন। সেই জমি বানাতে গিয়ে আহমদীর হত্যাতে যে জনসহানুভূতি সেই সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে হোম মিনিস্টার অব ইন্ডিয়ার পরামর্শে কেন্দ্রসরকারের চালক দলে যোগ দিয়ে এবারে মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন। ভারতের রাজনীতির পরিস্কার ছবি। 
আর ব্যার্থতা? ব্যার্থতা তাঁর না। ব্যার্থতা সিনেমা মাধ্যমটার। এই সামান্য সময়ের মধ্যে রাজনীতির কূটাভাসগুলোকে ধরা যায়, সামগ্রিকতায় গোটা দেশকে বেচে দেওয়া ধরা যায় না। তাও গানের মধ্যে যখন ভারত আর ইন্ডিয়ার দ্বান্দ্বিকতাকে ধরছেন তখন সেটা একটা স্টেটমেন্ট হয়ে দাঁড়ায়। গল্পের মধ্যে দিয়ে গেলে এমন একটা বিষয়কে ধরা যায় আংশিক ভাবে। সেটাই ধরেছেন দিবাকর। হাইকোর্টে বকোয়াস মামলা হয়েছিল গান নিয়ে। সেই মামলাও জিতেছেন। কিন্তু দর্শক? যে দর্শক এখন সিনেমা দেখতে যায় তারা তো এই ভারতনগর গড়ে ওঠার অংশ। এর বিরোধ করার কথা তাদের শপিং মল আর ডিস্কো থেকের দুনিয়ায় তারা স্বপ্নেও ভাবে না। তাঁদের জিতবেন কি?

জিতুন বা হারুন, ন্যাকা-বোকা মধ্যবিত্তের ঘামাচি মার্কা সমস্যার প্যানপ্যানানির তথাকথিত অন্যধারার বাইরে একজন বাঙালি একটা সপাট সিনেমা বানালো অনেকদিন পরে। ঋত্ত্বিক-মৃণাল-সত্যজিৎ-এর ব্যাটনটা কার হাতে সেটা বুঝতে এর পরেও আর কোনো সমস্যা থাকার কথা না। 

No comments: