Sunday, November 4, 2012

ওই দেখ, ঋত্ত্বিকের জুতো ছিঁড়ে গেল!



মাননীয় ঋত্ত্বিক ঘটক সমীপেষু,
কাল ‘মেঘে ঢাকা তারা’র পঞ্চাশ বছর পূর্তি হল। আপনি ছিলেন না বলে জানতে পারলেন না আমরা আপনাকে কত শ্রদ্ধা জানালাম।একটু বলি আপনাকে। তার আগে বলে নিই যে আপনাকে এই চিঠিটা বাংলায় লিখব না ইংরেজীতে তা নিয়ে একটু ভাবছিলাম। এটা ইন্টারনেট বা আন্তর্জাল। অনেক ভাষাভাষি মানুষ আছেন এখানে।তাঁরা যদি না বোঝেন? তারপরে ভাবলাম সেত সিনেমাও আন্তর্জাতিক। তারপরেও আপনি তো বাংলাতেই সিনেমাটা বানিয়েছেন এবং এখন এই ‘মেঘে ঢাকা তারা’ দেখে বিদেশিরা ধন্য ধন্য করছে বলে আমরা আজকাল গাল ভারী করি।
অনেকগুলো সিনেমা বানিয়েছিলেন আপনি, তার মধ্যে এটাই সব চেয়ে বেশী আলোচিত। কেন বলুন তো? আপনার কি মনে হয়? এর আগে ‘নাগরিক’ বানিয়েছিলেন সেটা মুক্তি পেলো আপনার মৃত্যুর পরে। ‘পথের পাঁচালী’র আগে বানানো চলচ্চিত্র। আপনি না হয়ে, আরেক লম্বা সত্যজিৎ হয়ে গেলেন বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার আইকন। আপনি না মশাই কিছু জিনিস আদৌ বুঝতেন না। পার্টি আপনাকে পুদোভকিন-কে সামলাতে পাঠালো আর আপনি গোছাতে পারলেন না? মাণিকবাবুকে দেখুন তো! রেনোয়ার সঙ্গে থেকে শুধু কতদুর যোগাযোগ বানিয়ে নিলেন? ন্যু ইয়র্কে ম্যুজিয়াম অব মডার্ণ আর্ট-এ ‘পথের পাঁচালী’ দেখিয়ে দেওয়া হল। চলচ্চিত্র বানালেই হবেনা, সেটা দেখাতে হবে। আপনি পুদোভকিন-কে ধরে আর কিছু না হোক স্লাভিক দেশগুলোতে তো ব্যবস্থা করতে পারতেন?
আমাদের দেখুন তো, এসব আমরা কম বুঝি? সে যাই বানাই না কেন কোন ফেস্টিভ্যাল-এ যাওয়া উচিত তা নিয়ে আগে থেকেই আমরা বিষম চিন্তিত। আসলে আপনি না মধ্যিখানে খুব ঝুলেছেন। একবার বানাবেন ‘বন্দুকবাজ’, কখনো বিমল রায়-এর সহকারী হবেন, কখনো তার হয়ে ‘মধুমতি’ লিখবেন, এসব করলে চলে? লোকে বুঝতেই পারেনি আপনি কি? নব সিনেমার পথিকৃত না কি কামাতে চান? খেতে হত? হা হা হা হা! শিল্পের লোকের আবার খাওয়া! এই যে আপনি বাংলা খেতেন, খাবার খেতে পেতেন না বলেই আমরা ধরে নিয়েছি শেষ দিকে, সেটাকেই আমরা উচ্চাবচ অবস্থান দিয়ে থাকি। আপনার স্ত্রী যে কিছু উপার্জন করতেন সেটাকে নাম্বারই দিই না। যেমন এখনো আমাদের অনেকের মনে হয় সুকান্ত-র পরিবার ছিল খুব দরিদ্র, তাই সুকান্ত অমন কবিতা লিখতেন আর যক্ষায় মারা গেলেন! বেশ লাগে ভাবতে কিন্তু। একটা বিপ্লবী ভাব হয় মনে। আপনাকে নিয়েও অমন একটা গর্ব আছে মনের ভিতর। সিনেমার জন্যে আপনি খেতে পান নি। এই যে আপনার স্যাক্রিফাইস, এর জন্যে আমাদের একটা শেয়ার হয়েছে বিশ্ব-সিনেমায়। আমরা আমাদের ভ্যান গখ পেয়ে গেছি। এই যে আপনি, এই আপনাকে দেখতে পাই এই ‘মেঘে ঢাকা তারা’-য়! মানে দেখে ফেলি। ওই দেখ, ঋত্ত্বিকের জুতো ছিঁড়ে গেল। ঋত্ত্বিক উদবাস্তু না? আপনি তাড়া খেয়ে এসেছিলেন? নাকি আগে থেকেই আপনার পরিবার এখানে থাকতেন? সে সব খুব ভাল করে সকলে জানিনা। জানতে চাইওনা। শুধু জানি আপনি মানে বাংলাদেশ থেকে আসা উদবাস্তু, যার ট্রেনের শট-টা থেমে যাবে সীমান্তের কাছে। দুর্গা, উমা, শঙ্কর, রাম, সীতা এসবের অনুষঙ্গে ছড়ানো থাকবে আপনার ক্যানভাসের চিত্র-চরিত্রাবলী। অনেক কিছু করবেন আপনি ওই নীতার মত, কিন্তু দাম পাবেন না। ভালবাসবেন রক্ত-ক্লেদ-ঘামে, ভালবাসা পাবেন না। ব্যার্থ হবেন। আমরা উল্লসিত হব। এই তো পেয়েছি! আরেক কর্ণ! অন্যায় যুদ্ধে যার পতন। নীতার প্রেমিক-কে ছিনিয়ে নিল নীতার বোন। ছিঃ!
সভ্যতার একটা উলটো পিঠ থাকে। সেটা কে যদি দেখতে না পাওয়া যায় তাহলে বেশ সমস্যা হয় সভ্যতা বুঝতে। সাদার প্রেক্ষিত না থাকলে কালো বুঝিনা যেমন, তেমনি আর কি! আপনি আমাদের সেই প্রেক্ষিত। আপনাকে দেখে আমরা শিখি কি কি করতে নেই! বাজে সিনেমার, পরিচিত, ভাল যোগাযোগ-ওয়ালা এবং বড় ডিরেক্টরকে সব সময় ভাল বলতে হয়। বন্ধু-বান্ধব বুদ্ধিজীবি হলে খুব খারাপ লিখলে, আঁকলে বা নাট্য পরিচালনা করলেও বলা যাবে না খারাপ। কারণ সে শোধ নেবে, বদলাবে না। সেই শেষ কথা এই বোধ তার হয়েছে বলেই সে বুদ্ধিজীবি। এই বোধকে সে বজায় রাখতে জায়গায় জায়গায় পূজো দেয়। কাজেই আপনার মত পোকামাকড় নিয়ে লেখে আমরা বলবো না কাউকেই।
এই উত্তর উপনিবেশ দেশেও সাহেব সাহেব জীবনযাপন চাই আমাদের। রাস্তায় বসে আড্ডা দিলে, সকলের নাগালের মধ্যে খালাসিটোলায় বসে মদ খেলে লোকে পাত্তা দেবে না জীয়ন্তে। রাজনীতির শীর্ষস্থানীয়দের বলা যাবেনা চোর বা ভুল; দুটোতেই সমান বিপদ! একদলের কাউকে বললে অন্যদল খুশী হবে বাইরে, কিন্তু ভেতরে সেও আপনাকে সন্দেহর চোখেই দেখবে। তাকেও যদি ঘুরে বলে দ্যান? সেও তো একই গোয়ালের গরু। ইংরেজী চিবিয়ে না বললেও বাজারের পদ্ধতিতে অন্তত ককনি বলতেই হবে, নইলে আপনি অচল।দেখছেন অশোক দিন্দা-কেও আইপিএল-এ ইংরেজী বলতে হয়! বাংলা ছেড়ে দিন, নিতান্ত হিন্দিতেও সে কথা বলতে পারেনা পুরস্কার নিতে। স্পন্সর সব দিক দেখে রাখেন, পুরস্কার-ও এসব না দেখে আসেনা।
আর অবশ্যই আপনার মত সিনেমা বানানো যাবেনা। অভাব নিয়ে সিনেমা আজকাল আর চলেনা। ভারত এখন জগত সভায় বড় আসন নিয়েছে। সেখানে তার কোনো দারিদ্র নেই। সে এখন ন্যুক্লিয়ার সুপার পাওয়ার। অন্য দেশকে সে পরামর্শ দেয় কিভাবে অর্থনীতি সামলাতে হবে। হুঁ হুঁ! ভাবছেন কি? আমেরিকা স্বয়ং শোনে তার কথা, মানে তার প্রধানমন্ত্রীর কথা। সে আফঘানিস্তানকে ঋণ দেয়। তার ব্যবসায়ীরা অন্য দেশের কোম্পানী কেনে। এখানে দারিদ্র? ও সব আসলে কুঁড়েমির জন্যে। এখানে সমস্যা হল মধ্যবিত্তের পরকীয়ার অক্লান্ত ইচ্ছে। একঝাঁক তরুণ-তরুণীর রক গাইতে না পারা, নিদেন পক্ষে এনআরআই-দের আত্মপরিচয়। এসব নিয়ে সিনেমা আজ!
দারিদ্র নিয়ে ছবি হত এনএফডিসি-র আমলে। আজকাল সে টাকা দেয়না আর! এসব আপনি বুঝতেন না। আর তাই যত্ত সব সিনেমা বানিয়েছেন হয় দারিদ্র নয় আদর্শের সংঘাত এসব নিয়ে।নাটকের দলের সমস্যা নিয়ে। এসব নিয়ে সিনেমা হয়? নাটকের বিপ্লবী দলে নারী-পুরুষ কে কার ঘনিষ্ঠ হবে তা নিয়ে কখনো সমস্যা হয়েছে আজ অবধি? কেউ ওখানে ইগোতে ভুগেছে নাকি? সবাই এখানে দিনে ও রাত্রে শুধু বিপ্লব করে আর দেশ গড়ে। কাজেই আপনি যা বানিয়েছেন তা বানানো যাবেনা। ‘কোমল-গান্ধার’ বা ‘যুক্তি তক্কো আর গল্প’-র অনুসন্ধানের কোনো মানে নেই।
তবু আমরা আজকে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ নিয়ে কথা বলছি। বলছি এই কারণে যে নীতার যা হয়েছিল তা হল আপনার হওয়াটা! অনেক চেষ্টা করে, অনেক স্বপ্ন দেখে, অনেক ভালবেসে, অনেক লড়াইয়ের রাস্তা পেরিয়ে তাকে তার ভেতরের রোগ, তার হেরে যাওয়া কুড়ে কুড়ে খেতে শুরু করলো। শিলং-এর পাহাড়ে একমাত্র শিল্পি দাদার- সেই অপদার্থ দাদা- যে সংসারের সব দায় আপাতদৃষ্টিতে ত্যাগ করে গেছিল, তার বুকের মধ্যে ভেঙ্গে পড়তে হয়। ‘বাঁচতে’ চেয়েছিল নীতা। আপনারই মত! নীতা সবের মধ্যে বেঁচে থাকাকেই প্রধান করেছিল। সেখান কোন কিছুই তাকে দমাতে পারেনি অনেক কাল। কারণ একমাত্র বেঁচে থাকলেই সে পারবে ভালবাসতে, নতুন কিছু আবার গড়ে তুলতে। কিন্তু একের পর এক বিশ্বাসঘাতকতা, একের পর এক দলছুট হওয়া তাকে এক সময় পেড়েই ফেলল। আপনাকেও পেড়ে ফেলেছিল। বাংলার বোতল ক্যামেরার উপর উপুর করে নীলকন্ঠ চলে গেলেন। আপনি? বোতল ছাড়াই গেলেন, কিন্তু বিষটা ঝেড়ে দিয়ে গেলেন তো? আমরা এই আপনাকে মেপে নিতে বারেবারে দেখি ‘মেঘে ঢাকা তারা’, যাতে আর কেউ আমাদের এভাবে পেড়ে না ফেলতে পারে। ঋত্ত্বিক, আপনি এখানে The Outsider!  আর আমরা ব্যবস্থা। এই পঞ্চাশেও বোঝাপড়াটা শেষ হল না, হয়তো একশো-তে হবে!
ইতি,

No comments: